দেওয়ানগঞ্জ রেল স্টেশন থেকে বাহাদুরাবাদ ঘাট বীরহলকা পর্যন্ত দুই কিলোমিটার অব্যহৃত রেললাইনের কোটি টাকার জমি বেদখল হয়ে যাচ্ছে। রেলের পরিত্যক্ত জমিতে স্থানীয় ভূমিহীন ও নদী ভাঙনকবলীত মানুষেরা অবৈধ ভাবে গড়ে তুলছেন বসতবাড়ী। অন্য দিকে দীর্ঘদিন থেকে ওই রেলপথে ট্রেন ও মালবাহী ওয়াগন চলাচল না করায় পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার রেলপাত, স্লিপারসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদী।
রেল কর্তৃপক্ষের সঠিক তদারকি না থাকায় ওই রেলপথের বিভিন্ন স্থানে চুরি হচ্ছে রেলপাত, স্পিপারসহ অন্যান্য মূল্যবান যন্ত্রাংশ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাহাদুরাবাদ ঘাটটি ১৯৩৮ সালে বাহাদুরাবাদ এলাকায় নির্মিত হয়। বাংলাদেশে রেলের তত্বাবধানে দেশের উত্তরপশ্চিমা লের গাইবান্ধা, দিনাজপুর, রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, লালমনির হাট, বগুড়া, নওগা, জয়পুরহাটসহ কয়েকটি জেলার সাথে দেশের পুর্বাঞ্চল ও ঢাকার যোগাযোগের জন্য যমুনার পূর্বপাড়ে বাহাদুরাবাদ ঘাট ও পশ্চিমপাড়ে গাইবান্ধার ফুলছড়ির তিস্তামুখ ঘাট নির্মাণ করা হয়। যাত্রী পারাপার ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের উদ্দেশ্য নিয়ে ফেরিতে যাত্রীবাহী ট্রেন ও মালবাহী ওয়াগন পারাপার করানো হয়। এতে ওই জেলাগুলোর সাথে রাজধানী দুরত্ব কমে আসে দেড়শতাধিক কিলোমিটার। যাত্রীপারাপারের পাশাপাশি শিল্প ও উৎপাদিত কৃষিজ পণ্য পারাপারে ব্যাপক সুবিধা ও সহজতর হয়।
যমুনা নদীর ভাঙনের ফলে পরবর্তীতে বাহাদুরাবাদ এলাকা থেকে ঘাটটি সরিয়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরে বড়খালে স্থানান্তর করা হয়। একই কারণে সেখানে ঘাটটি বেশিদিন টিকেনি। পরে ক্রমান্বয়ে ইসলামপুরের কুলকান্দি ও সর্বশেষ দেওয়ানগঞ্জের বীরহলকা ফুটানীবাজার এলাকায় ঘাটটি স্থানান্তর করে রেলকর্তৃপক্ষ। ২০০৭ সালে যমুনা নদীর নাব্য না থাকায় ঘাটটি বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে পড়ে যাত্রীবাহী ফেরি ও মালবাহী ওয়াগন পারাপার। ফলে বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সময়ের পরিক্রমায় দেওয়ানগঞ্জ রেল স্টেশন থেকে বীরহলকা এলাকায় বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত দুই কিলোমিটার রেলপথ অব্যহৃত অবস্থায় পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। নদী ভাঙনের ফলে বড়খাল, কেল্লকাটা, বীরহলকা ও চাকুরীয়া গ্রামের কয়েক শত ভূমিহীন মানুষ বসতী স্থাপন করে রেলের জমিতে।
সরেজমিনে আগের মতো নেই আর বাহাদুরাবদঘাটে জৌলুস। নেই হকারদের হাঁকডাক, যাত্রীদের ভিড়। চারিদিকে এক প্রতিকূল পরিবেশ, তার মাঝেও গড়ে ওঠেছে মানুষের বসতবাড়ী স্থাপনা।দেওয়ানগঞ্জ রেল স্টেশন থেকে বাহাদুরাবাদ ঘাট গামী পরিত্যক্ত রেল পথের দুধারে বীরহলকা এলাকায় কয়েক শত মানুষের বসতবাড়ী দেখা যায়। দুপাশে বাড়ী, মাঝখানে পরিত্যক্ত রেলপথ। দির্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় রেলপথে মরিচা পড়ে গেছে। অনেকস্থানে স্লিপার চুরি হয়েছে। রেল লাইনের ওপরেও বিভিন্ন স্থাপনা তোলা হয়েছে। সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বাহাদুরাবাদ ঘাটের বিভিন্ন স্থাপনা ও অফিসঘর। যে টুকু অবশিষ্ট রয়েছে তাও নষ্ট হওয়ার পথে।
রেল কর্তৃপক্ষ জানায়, দেওয়ানগঞ্জ রেল স্টেশন থেকে বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত দুইকিলোমিটার রেলপাতের মূল্য প্রায় কোটি টাকা এবং রেলের জমির মূল্য কোটি টাকার উপরে। সঠিক রক্ষাবেক্ষন ও তত্বাবধানের পরেও রেলের জমি বেদখল ও রেলপাত, স্লিপার ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বাহাদুরাবাদ ও বালাসী ঘাটের মধ্যে ফেরিচলাচল করলে ওই পরিত্যক্ত রেল লাইন ব্যবহৃত হতো। তখন একদিকে লাঘব হতো উত্তর-পশ্চিমা লের মানুষের পূর্বাঞ্চলের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা। অন্য দিকে বেদখল ও অপচয়ের হাত থেকে বেঁচে যেত রেলের জমি, রেলপাতসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ।
বীরহলকা গ্রামের আবুল হোসেন বলেন, যমুনা তাদের বাড়িঘর বসতভিটা গ্রাস করেছে। পৈতিক সূত্রে সে ১৫ বিঘা জমি পেয়েছিল। সাজানো গোছানো ঘরবাড়ি ছিল। কিন্তু ১৪ বছর আগে যমুনার ভাঙনে সব বিলীন হয়ে যায়। এখন সে ওই গ্রামেরই পূর্ব পাশে রেল লাইনের ধারে সরকারি জমিতে বসতি স্থাপন করেছেন। এখন সে দিনমজুরী করে দিনাতিপাত করছেন।
কেল্লাকাটা গ্রামের দুদু মিয়া বলেন, আবাদী জমি ছিল ৫ বিঘা। সংসারে অভাব ছিল না। জমিচাষ করে ভালোই কাটছিল তাদের জীবন। কিন্তু সর্বনাশা যমুনা সে সুখ কেড়ে নিয়েছে। পরপর ৬ বার বাড়িঘর বসতভিটা যমুনার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন সে ৩ বছর থেকে বীরহলকা গ্রামে রেল লাইনের পাশে রেলের জমিতে মাথা গুজার ঠায় করে নিয়েছেন।
কেল্লাকাটা গ্রামের শুক্কুর আলী জানান, জমাজমি নেই। নেই মাথা গুজার ঠাঁয়। বাধ্য হয়ে সে ৩ বছর আগে পরিবার পরিজন নিয়ে রেল লাইনের ধারে রেলের জমিতে ঘর ওঠেয়ে বসবাস করছেন। বিগত সময় পাঁচবার যমুনা নদী বাড়িঘর বসতভিটা ভেঙেছে। ১০ বিঘা আবাদী জমি ছিল তাও বিলীন হয়ে গেছে। রেলের জায়গা ছাড়া তার বাড়ি করে থাকার মতো জায়গা নেই।
বড়খাল গ্রামের শ্যামলের স্ত্রী সুবেসী রাণী বলেন , ২০ বছর আগে যমুনা নদীতে তার বসতবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। তথন থেকে সে পরিবার নিয়ে বীর হলকা গ্রামে রেলের জমিতে বসবাস করছেন। এ ছাড়া তার আর বাড়ী করার জায়গা নেই। সরকার তাড়িয়ে দিলে খোলাআকাশের নিচে বসবাস করতে হবে। তার স্বামী দিনমজুরী করে। জমি কেনার মতো তাদের কোনো সাধ্য নেই।
বাংলাদেশ রেলের এসএসএই ওয়ে দেওয়ানগঞ্জ বাজার মো. আবু সাঈদ বলেন, দেওয়ানগঞ্জ বাজার থেকে বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত রেল লাইনের রেলপাত দীর্ঘ দিন থেকে অব্যহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। যার মূল্য অন্তত আশি থেকে নব্বই লক্ষ টাকা হবে। পুরাতন হয়েছে। খোলা আকাশের নীচে থাকায় মরিচা পরছে। আমরা নিয়মিত তা তদারকি করছি। আমাদের পক্ষ থেকে তদারকির কোনো গাফিলতি নেই।
স্টেশন মাস্টার মো. আব্দুল বাতেন বলেন, দেওয়ানগঞ্জ বাজার রেল স্টেশন থেকে বাহাদুরাবাদ ঘাটে কোনো ট্রেন চলাচল করছে না। লাইনগুলোতে রেলের পাত পড়ে আছে। সময়ের ব্যবধানে তা অনেকাংশে নষ্ট হচ্ছে। রেলের জমিতে নদী ভাঙা নিঃস্ব মানুষেরা বাড়ি করে দীর্ঘ দিন থেকে বসবাস করছেন। তারা ভূমিহীন। এ রেলপথে রেলপাত, অন্যান্য যন্ত্রাংশ ও জমি বাবদ কয়েক কোটি টাকার সম্পদ পড়ে আছে। রেলের সংশ্লিষ্ট বিভাগ তা নিয়মিত তদারকি করছেন।