‘নতুন বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের পথে সম্ভাবনাময় অগ্রযাত্রার পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ আছে বলে মনে করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
কর্তৃত্ববাদী সরকার পতনের ১০০ দিনের ওপর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে মঙ্গলবার নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এমন মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।
টিআইবি মনে করে, অন্তর্বর্তী সরকার অনেক সময়োচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ
পদক্ষেপ নিয়েছে, যা ‘নতুন বাংলাদেশ’র অভীষ্ট অর্জনের সহায়ক। তবে একইসঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে রয়েছে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ।
ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন আত্মত্যাগের বিনিময়ে কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের মাধ্যমে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কারের চলমান প্রক্রিয়া অটলভাবে চলমান
থাকবে আশা প্রকাশ করে সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,
‘কর্তৃত্ববাদের সৃষ্ট বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ১০০ দিনে অন্তর্বর্তী সরকার অসংখ্য সময়োচিত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে,
আবার, আন্দোলনে সংঘটিত সহিংসতার বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট ও তথ্য-প্রমাণভিত্তিক মামলা দায়ের করার উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।
এ ছাড়া ঢালাওভাবে শত শত মামলায় শত শত ব্যক্তিকে আসামি করার ফলে মূল অপরাধীর উপযুক্ত বিচারের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন, দুদক,
মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন পুনর্গঠনে চ্যালেঞ্জ অব্যাহত রয়েছে।
এতে দেখা গেছে, সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অ্যাড-হক প্রবণতা, উপদেষ্টা পরিষদ গঠন ও দায়িত্ব বণ্টনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বিতর্কিত হয়েছে।
প্রশাসন পরিচালনায় সরকারের দক্ষতা ও কর্মপরিকল্পনার ঘাটতি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্বশীলদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রকাশ পেয়েছে।
এমনকি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক
সংস্কারের ক্ষেত্রে দলীয়করণের শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত বিধায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি বাড়ছে বলে শঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে দখল ও আধিপত্য বিস্তারের সংস্কৃতি এখনো চলমান—
একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ও দলীয়করণের পরিবর্তে আরেকটি গোষ্ঠীর প্রতিস্থাপন বা হাতবদল হয়েছে বলে লক্ষ করা যায়।
কর্তৃত্ববাদ পতনের ক্ষেত্রে আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বে ইতিবাচক ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও পরবর্তী সময়ে
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব সত্ত্বেও
শান্তি-শৃঙ্খলা নিশ্চিতে প্রত্যাশিত পর্যায়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকার ঘাটতি লক্ষ করা যায়।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন অংশীজনের পক্ষ থেকে সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারকে প্রয়োজনীয় সময় দেওয়ার প্রশ্নে ধৈর্যের ঘাটতি লক্ষণীয়।
রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ সংস্কার নিয়ে এখনো কোনো উদ্যোগ লক্ষ করা যায়নি,
যা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও রাষ্ট্র সংস্কারের মূল চেতনা ধারণ করার ক্ষেত্রে
ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ বলে চিহ্নিত করা যায়। এ ছাড়া ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অভূতপূর্ব বিকাশ ও প্রভাব লক্ষ করা যায়।
গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ভূমিকা অসাধারণ। তাদের সীমাহীন ত্যাগ ও সাহস না থাকলে এই অভূতপূর্ব অর্জন কোনোভাবেই সম্ভব হতো না।
তবে আন্দোলনকারী ছাত্রদের অগ্রাধিকার রাষ্ট্র সংস্কার হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনড় অবস্থান ও রাজনৈতিক সহনশীলতার ঘাটতি রয়েছে।
গণমাধ্যমের ওপর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণ ও হুমকি-হামলাসহ কোনো কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ করার তৎপরতা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
কোনো কোনো মহলের অতিক্ষমতায়ন ও তার অপব্যবহার এবং চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা অসাম্প্রদায়িক সম-অধিকারভিত্তিক ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের অভীষ্টের পথে অন্তরায়।
সহিংসতা ও বলপ্রয়োগের কারণে জেন্ডার, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।
তা ছাড়া, ভারত কর্তৃক কর্তৃত্ববাদ পতনের বাস্তবতা মেনে নিয়ে নিজেদের ভুল স্বীকারে ব্যর্থতা ও তার কারণে অপতৎপরতার ফলে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েনে সরকার ও দেশের জন্য ঝুঁকি বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি মনোভাব ইতিবাচক হলেও প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক সহায়তা, বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক,
এডিবি ও আইএমএফের মতো সংস্থার ঋণ সহায়তা-সংশ্লিষ্ট শর্তাবলি ও বিশেষ করে ইতোমধ্যে সুদসহ ঋণ পরিশোধের অতিরিক্ত দায় সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণা প্রতিবেদনে।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাহজাদা এম আকরাম গবেষণার পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেন। সেই সময় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ছাড়াও
উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের,
গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান। টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন।